Tuesday, 12 January 2016

মেডেল



মেডেল
-      মলয়কান্তি দে
আমাদের রাধানাথপুর বাগানের বাঘুয়া সর্দারের আসল নাম কিন্তু বাঘুয়া নয়। আসল নাম তার সোমরা ভূমিজবাঘুয়া নামটা সে পেয়েছিল বাঘ মেরে। বাঘুয়া, বাঘু, বাঘা - যার যেরকম মুখে আসে ডাকতএখন অবশ্য কেউ আর সেরকম ডাকে না, সকলের মনেও নেই কথাটাএখন কেবল সোমরা নিজেই মাঝে মাঝে মাতলামির ঝোঁকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাটা বলে। শুনে কেউ কেউ মাথা নাড়ে। হ্যাঁ। কথাটা ঠিক বটেঅনেকেই জানে যে শুধুমাত্র একটা পাকা বাঁশের লাঠি সম্বল করে সোমরা বাঘ মেরেছিল সেদিন   
কি করে কী হয়েছিল সেটা অবশ্য কারো কাছেই তেমন পরিষ্কার নয়। এমনকি সোমরার কাছেও নয়। তার তো তখন মাথা মগজ ছিল মদে চোবানো। আর সময়টাও তখন ছিল সোমরার মাথার মতই, আলোয় অন্ধকারে ছানামাখাশীতকালের শেষরাত। আকাশে গোল্লা সাবানের সরু ফালির মত এক ফালি চাঁদ কুয়াশার চাদরে জ্যোৎস্না ঢালছেকিন্তু মাটিতে হামাগুড়ি দিচ্ছে অন্ধকারঝোপ  ঝাড় গাছপালায় লেপটে আছে অন্ধকারএমনই এক আধখ্যাঁচড়া সময়সোমরা তো তেমন কোনও হাটে গঞ্জে নাম থাকা  মহাশক্তিধর ছোকরা ছিল না যে লোকেরা ওর বাঘ মারার গল্প শুনে এক কথায় ঘাড় নেড়ে মেনে নেবেউঠতি বয়সের ছেলে, গায়ে জোর আছেফুটবলের শট দেখলে সেটা বোঝা যায়। আবার সমবয়সীদের সাথে হুটোপাটি কিংবা কুস্তি-কাবাডিতেও মালুম পড়ে। রংবাজী আছে, দাদাগিরিও আছে। তা বলে শুধু গায়ের তাকতে, স্রেফ একটা লাঠি হাতে, বাঘ মেরে ফেলবে? অথচ বাঘটা মরেছে, সবাই দেখেছে। আর সোমরার কাছে তখন শুধুমাত্র একটা পাকা বাঁশের লাঠি ছাড়া কিছুই ছিল না, সেটাও সবাই দেখেছে। চোখের দেখা বিশ্বাস করতেই হয়। সবাই তাই ঢোক গেলার সাথে কথাটা গিলে নিয়েছে।
সে রাতে যাত্রাপালার আসর বসেছিল বাগানে। কাছের শহর থেকে হায়ার করে আনা যাত্রাপার্টি সোমরা আর তার সঙ্গীরা ছড়ি হাতে গণ্ডগোল সামলাতে ব্যস্ত ছিলপালা শুরু হয় রাত করে, তবে লোকের ভিড় পড়ে যায় সন্ধ্যা থেকেই। মেয়েরা তেরপলে বসে ইদিক উদিক তাকায়; হ্যাজাক বাতির আলো ঝলকায় তাদের চোখে বাচ্চারা ক্যাচর ম্যাচর করে বড়রা এদিক সেদিক হাঁটে আর তলবের টাকা যদি সামান্য বেঁচে আছে পকেটে, তো চলে যায় ঝোপের আড়ালেসেখানে চোলাই মদের আসর বসেছেঝান্ডিমুন্ডাও জমে উঠেছে। মাঝে মাঝে সোমরা বা তার সঙ্গীরাও দু এক ঢোক ঢালে গলায়। কিন্তু তাদের দায়িত্ব আছে। ছড়ি ঘোরাতে হবে। কোথাও কোনও হল্লা হতে দেওয়া চলবে না। হল্লা হলেই যাত্রাপার্টির লোকেরা সিন কেটে নেবে। পয়সা দিয়ে হায়ার করা যাত্রাপার্টি। সিন কেটে নিলে চলবে? কী করে বুঝবে সিন কাটা পড়ল কিনা? কে-ই বা মন দিয়ে পালা শুনছে যে গল্পের ফাঁক দেখেই বুঝে নেবে সিন কাটা গেছে! উপায় আছেবায়না করার সময় জেনে নিয়েছে যুদ্ধ ক’টা হবে। যে পালায় যুদ্ধ যত বেশী, সেই পালার তত চাহিদাসোমরা আর তার সঙ্গীরা তাই ছড়ি ঘোরায়, সবাইকে শান্ত রাখে, আর আঙুলে গুনে হিসেব রাখে, কটা যুদ্ধ গেল, কটা এখনও বাকিরাত এগোয়, পালা এগোয়, তালে তালে এগোয় সোমরাদের ঢোকে ঢোকে মদ গেলা। পালা শেষ হতে হতে দু একজন এদিকে ওদিকে এলিয়ে পড়ে। পালা শেষ হলে অন্ধকার নাটমন্দিরে শতরঞ্চি মুড়ি দিয়ে ঘুমোয়।  
পালা যখন প্রায় শেষের দিকে, মদের নেশা চড়ে গিয়ে শান্তিরক্ষকদের মধ্যেই কাজিয়া লেগে গেল। সবাই দেখল সোমরা আর তার এক গলায় গলায় বন্ধুর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে চিৎকার-গলাবাজি সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে এই যুটির আস্ফালন দেখছে পালার লোকেরা পালা থামিয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে সোমরা কোত্থেকে জোগাড় করেছে একটা পাকা বাঁশের লাঠি। তা দেখে ওর প্রতিপক্ষটিও এদিক ওদিক তাকিয়ে আর কিছু না পেয়ে প্যান্ডেলের একটা খুঁটিই টেনে তুলতে যায়। বাকিরা হা হা করে ওঠেএই খুঁটি  তুলে ফেললে পুরো প্যান্ডেলটাই হুড়মুড়িয়ে পড়বে। সঙ্গীরা দুই যুযুধান বন্ধুকে টেনে সরিয়ে নিল দুদিকে। আবহ একটু শান্ত হয়ে এলে থেমে থাকা পালা আবার বাজনার ঝনৎকারের সঙ্গে চালু হল। সোমরাকে তার সঙ্গীরা টেনে সরিয়ে নিয়ে বসিয়ে রেখেছিল অন্ধকার চা-ঘরের পাকা বারান্দায়। সেখানে বসে বসে সোমরা ঝিমোতে থাকে, তারপর কাঠের খুঁটিতে হেলান দেয়, এবং একসময় শুয়েই পড়ে।  
এই অবধি ঘটনার সাক্ষী আছে। আর এর পরের যে দৃশ্যটির কথা সবাই জানে তা হল, সকালের আলো ফুটলে দেখা গেছে, নিস্তলের ছড়াটার উপর কাঠের কালভার্টের এক প্রান্তে ধুলোয় রক্তে মাখামাখি অবস্থায় অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে সোমরাএকটু পরেই কারও নজরে পড়ল, তলায় ঝর্নার কিনার ঘেঁষে নুড়ি পাথরের মাঝখানে পায়ের পাতা ডোবা জলে একটা বাঘও মরে পড়ে আছেখুব বড় নয়, কিন্তু সত্যিকারের বাঘ। মাথার থ্যাঁতলানো ক্ষত থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত পাথরের উপর জমে থকথকে যারা দেখতে পেয়েছিল, তারাই সোমরাকে পাঁজকোলা করে উঠিয়ে আনে, বাগানের গাড়ি করে নিয়ে যায় কাছাকাছি হেলথ সেন্টারে মরা বাঘটাকেও নিয়ে আসে বাগানের অফিস ঘরের সামনে। সোমরার গায়ে বেশ কিছু কাটা ছেঁড়ার চিহ্ন ছিল। হেলথ সেন্টার থেকে ওকে আবার কাছাকাছি ব্লক হাসপাতালে পাঠায়বিকেলের দিকে ওর জ্ঞান ফিরে এলেও সে কথা বলার মত অবস্থায় আসে পরদিন দুপুরের দিকে। আর তারপর যে ভাষ্য শোনা যায় ওর মুখে, ধরে নেওয়া যায় তাতে রঙ মাখানো নেই। কারণ সেই ব্যান্ডেজ বাঁধা শরীরে হাসপাতালের খাটে শুয়ে ঘটনাটিতে রঙ মাখানোর মত কেরামতিওলা মাথা তার নয়। বরং যা ঘটেছিল তাতে নিজেই সে হতভম্ব। তার মুখে শোনা ঘটনাক্রম হচ্ছে এই-  
চা-ঘরের বারান্দায় শুয়ে তার ঘুম এসে গিয়েছিল। ঘুম যখন ভাঙলো, চারদিক তখন শান্ত, স্তব্ধ। মরা জ্যোৎস্নার ফিকে আলোয় দেখা যাচ্ছে ফাঁকা নাটঘর মাথার ভিতরটা মনে হচ্ছিল আলকাতরার মত জমাট আর নিরেট। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকার পর অস্পষ্টভাবে তার মনে পড়েছিল পালার কথা, বন্ধুর সাথে রাগারাগির কথা রাগের ঝাল পুরোপুরি মেটাবার আগেই অন্য বন্ধুরা ওকে সরিয়ে এনেছিল। আটকে  থাকা সেই রাগটা যেন হঠাৎ তার মস্তিষ্কের অলিগলিতে ছড়িয়ে যায়। উঠে দাঁড়ায় সেবাঁশের লাঠিটা, যেটাকে সে কিছুতেই হাতছাড়া করে নি এতক্ষণ, সেটাকে শক্ত হাতে ধরে একবার বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠলো, আয়, কোন শালা আসবি। কোনও প্রতিপক্ষ এগিয়ে না আসায় অকারণেই হাতের লাঠিটা বাঁই বাঁই করে ঘুরালো দু’বার। লাঠিটাকে তার হাতে বড় মাপসই মনে হয়েছিলএরপর সে কুলি-লাইনের দিকে হাঁটা দেয়রাস্তা কিংবা আশপাশ, কিছুই তার চোখে স্পষ্ট ছিল না। ঘটনার বর্ণনা দেবার সময় ভাবতে চেষ্টা করলে কোনও দৃশ্যই তার চোখে পুরোপুরি ফুটে উঠছিল না, অস্পষ্ট ঠেকছিলএসব সে নিজেই স্বীকার করেছিল বলার সময়দু বার বেশ জোরে হুঁচোট খাওয়ার কথাও তার মনে আছেসামলে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে নিস্তলের ঝর্নাটার কাছে এসে একটু দাঁড়ালো শীতের ঝর্না প্রায় শুকনো হলেও পাথরের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ কোথাও কোমর জল। দিনের বেলা হলে, আর এমন টালমাটাল অবস্থা না হলে, পাথরে পাথরে পা ফেলে সহজেই পার হওয়া যেত। পথ কমাতে এভাবেই যাওয়া আসা করে সবাই। মাতাল অবস্থায়  বিবেচনা শক্তি ঠিকঠাক কাজ না করায় সোমরা এই শর্টকাটের পথে এসে গিয়েছিল। এখন খেয়াল হয় যে এভাবে পার হওয়ায় ঝুঁকি আছে, তাই আবার অনেকটা উজিয়ে গিয়ে কালভার্টে ওঠে। কালভার্ট পার হলে কিছু ঝোপ ঝাড়, আর তার পরেই সোমরাদের বস্তি, কুলি লাইন
কালভার্টে উঠতে যাবে, ঠিক তখনই সোমরা শুনতে পেয়েছিল, কুলি-লাইনের দিকে একটা সোরগোল উঠেছেহল্লা চিৎকার আর টিন পেটানোর আওয়াজ। এই আওয়াজের মর্ম তার মগজে পুরোপুরি খেলবার আগেই সোমরা কালভার্টের উপর উঠে গেছে, আর তখনি সে দেখতে পায় উলটো দিক থেকে তীর-বেগে ছুটে আসছে কিছু একটা। শেয়াল? না কি অন্য কিছু? সামনে সোমরাকে দেখে সেই কিছু একটা থমকে দাঁড়িয়েছিল। আর তার পরই সোমরার দিকে লাফিয়ে উঠেছিল। সোমরার শুধু মনে আছে হাতের লাঠিখানা ওকে প্রচণ্ড শক্তি যোগাচ্ছিলকুলি-লাইনের দিক থেকে আসা সোরগোলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সে লাঠিখানা উপরে তুলে প্রাণপণ শক্তিতে একেবারে সামনে এসে পড়া সেই কিছু একটাকে আঘাত করেছিল। জন্তুটা প্রায় তার গায়ের উপরেই এসে পড়েছিল। সোমরার আঘাতটা ছিল মোক্ষমসেই কিছু একটা ছিটকে পড়েছিল রাস্তার উপর। এরপর আবার ছুটে এলে সোমরা কোনও বুদ্ধি বা কৌশলের ধারে কাছে না গিয়ে এলোপাথাড়ি লাঠি চালিয়েছিল। কালভার্টের সংকীর্ণ পরিসরে জন্তুটা বেকায়দায় পড়েছিল খুব। অনেকক্ষণ এভাবে লাঠি চালানোর পর একসময় সোমরা টের পায় তার লাঠি হয় রাস্তার পাথরে পড়ছে, নয় কালভার্টের কাঠের রেলিং-এসে বুঝতে পারে, সামনে এখন আর তার কোনও প্রতিপক্ষ নেইএকটু থেমে দম নিতে গিয়ে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে না সোমরা। অবসন্নের মত রাস্তার উপর বসে পড়েতারপর শুয়ে পড়ে। তারপর আর কিছুই মনে নেই তার
এই যা যা বলল সোমরা, এর কিছুই হয়তো বানিয়ে বলা নয়যা মনে আছে তাই বলেছেবা ওর যেরকম মনে আছে তাই বলেছেঘটনা যা ঘটল, আর সোমরা ঘটনাটা যেভাবে মনে রাখল, বা স্মৃতি থেকে তার যতখানি উদ্ধার হল, সে সবের মাঝে ফারাক থেকেই যেতে পারে। তাছাড়া মানুষ কখন যে তার চোখে দেখা সত্যের মধ্যে নিজের পছন্দের রঙ মিশিয়ে দেয় সে নিজেও জানে না। এইসব মিশেলের দায় কে নেবে! তখন বাগানে মাঝে মাঝে এমন বাঘ পড়ত কুলি-লাইনের কারো ছাগল গরু টেনে নিত। টের পেলে লোকেরা দল বেঁধে বেরিয়ে টিন বাজিয়ে, চিৎকার করে করে বাঘটাকে তাড়াবার চেষ্টা করত। সেদিনও এরকম তাড়া খেয়ে বাঘটা পালাতে গিয়ে পড়ে যায় মাতাল সোমরার মুখোমুখি। বেচারা বাঘটাকেও ঝর্না পার হবার জন্য ওই কালভার্টের রাস্তাই ধরতে হল। কি করে জানবে, এরকম একটা অদ্ভুতুড়ে সময়ে মাতাল সোমরা লাঠি হাতে ওই কালভার্ট ধরেই আসছে? আর আসছে তো আসছে একেবারে বেহেড মাতাল হয়ে! একটু হুশ বুদ্ধিতে থাকলে না হয় মনে ভয়ডর থাকতো, আর গোটা খেলাটাই তখন হত খেলার নিয়মে। কিন্তু হয়ে গেল বেনিয়মের খেলঅন্ততঃ বাগানের লোকেরা ঘটনাটাকে সেভাবেই নিল।
এমনিতে সারাক্ষণ ঝিম মেরে থাকা চা বাগানের জীবনটা সোমরার বাঘ মারার খবরে যেন হঠাৎ ঝাঁকুনি খেয়ে নড়ে উঠল। একদল সেই সাতসকালে ট্র্যাক্টরের ট্রেলারে শুইয়ে সোমরাকে প্রথমে হেল্‌থ সেন্টার, পরে ব্লক হাসপাতালে নিয়ে গেল। আরেক দল ছুটলো, সবাইকে খবরটা দিতে। একজনের থেকে অন্যজন হয়ে সারা বাগান জেনে গেল, সোমরা বাঘ মেরেছে। বাগানের মানুষের জীবনে নিয়মের জন্ম মৃত্যুর চেয়ে বড় মাপের ঘটনা সচরাচর ঘটে না। এখন এত বড় মাপের একটা ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে মানুষগুলো ভেবে পাচ্ছিল না একে জীবনের কোন কুলুঙ্গিতে রাখবেউৎসাহে টই টম্বুর হয়ে ওরা শুধু একে অন্যকে বলতে লাগল, শুনলি কথাটো? বড়বাবু থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হয়ে খবর পৌঁছলো ম্যানেজার সাহেবের কানে। ম্যানেজার সাহেব নির্দেশ পাঠালেন, বড়বাবু যেন নিজে সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দর করে বাঘের চামড়া ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন, যেন কোনও খুঁত না থাকে। এর বেশী কিছু বলার দরকার ছিল না। বাগানের অফিস সকাল সাতটায় শুরু হয়। বড়বাবু সাতটার মধ্যেই পৌঁছে যান অফিসে। তিনি দায়িত্ব নিয়ে বাঘের চামড়া ছাড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। মাথার যে জায়গায় চামড়া থেঁতলে গেছে,  সেই জায়গা সে রকমই থাকল। মাংসের ব্যাপারে মাথা ঘামালেন না। সোমরাদের বস্তির লোকেরা মাংস নিয়ে গেল। চামড়াখানা চলে গেল ম্যানেজারের বাংলোয়।  
এদিকে লোকের মুখে মুখে চারদিকে রটে গেছে রাধানাথপুরের সোমরা ভূমিজের বাঘ মারার কথা। কেউ শুনেছে লাঠি দিয়ে, কেউ শুনেছে খালি হাতেই, কুস্তি করেকুলি লাইনের আরও কেউ কেউ অবশ্য কৃতিত্বের দাবী তুলেছিল। কেউ বলেছিল, ওর ছুঁড়ে মারা পাথরের ঘা খেয়েই বাঘটা মরেছে, কেউ বলেছিল ওর লাঠির আঘাতেই বাঘটার কোমর ভেঙ্গে গিয়েছিল। ভেবে দেখলে এটাও সত্যি যে পেছনে টিন বাজিয়েদের খেদা না থাকলে বাঘটা ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে পড়ত, এ ভাবে পুলের উপর দিয়ে ছুটতো না। কিন্তু অন্য কোনও দাবী ধোপে টিকলো না। রাধানাথপুরের জীবনে এটা এমনই এক ঘটনা যা আশপাশের দশটা বাগানে কখনও ঘটতে শোনেনি কেউতখন তো এই সবগুলো বাগানই ছিল জঙ্গলের সাথে ঘেঁষাঘেঁষি করেসব বাগানেই দু পাঁচ বছরে এক আধবার বাঘ পড়তে শোনা যেত লোকের ছাগল, গরু টেনে নিতবেশীর ভাগ ক্ষেত্রে শ্রমিকদের চিৎকার আর টিন পেটানোর আওয়াজে বাঘ পালিয়ে যেতক্বচিৎ কখনও শোনা গেছে অমুক বাগানে বাঘের সন্ত্রাসে বাধ্য হয়ে শহর থেকে শিকারি আনা হয়েছেসেই শিকারি গাছের ওপর মাচান বেঁধে বন্দুক তাক করে বসে থেকেছে সারা রাত। বাঘ মারা পড়লে এলাকা জুড়ে খবর হয়েছে। আর রাধানাথপুরের ভাগ্যে কি না একেবারে মুখোমুখি লাঠি দিয়ে বাঘ মেরে ফেলা, আর তাও কি না আমাদেরই ঘরের ছেলে সোমরার হাতে! এই পুরো অঞ্চলের বাগানী মানুষের চোখে সোমরা হিরো বনে গেলআর রাধানাথপুরের মানুষের কাছে সে হয়ে গেল বাগানের গর্ব। হামদের সোমরা, হামদের বাঘুয়া সোমরা, হামদের বাঘুয়াটো 
মেডেলের কথাটা সোমরার মাথায় ঢোকে হাসপাতালে থাকার সময়। এগারো দিন হাসপাতালে ছিল সেহাসপাতালে ওকে দেখতে আসা বন্ধুদের মুখে শুনেছে বাগানে ওকে নিয়ে তোলপাড় হচ্ছেসোমরা শুনে হাসত, আর মনে মনে বুঝতে চাইত, কেমন হয় সেই তোলপাড়। তবে খ্যাতির স্বাদ সে প্রথম পেল এই হাসপাতালেই। বাঘের সাথে লড়াই করে জিতে আসা একটা ছেলে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, এমন খবর চাউর হওয়া মাত্র ওকে দেখার জন্য ভিড় জমে গেল। প্রথম দিকে সোমরা একটু গুটিয়েই থাকত। একে তো এটা তার চেনা পরিবেশ নয়। তার ওপর ও যে বাঘ মেরেছে, এই ধারণাটাই ওর  ভেতরে ঠিক শেকড় গাড়তে পারছিল না। ওর কাছে তখনও পুরো ব্যাপারটাই ছিল এক মাতাল মস্তিষ্কের আলো-আঁধারিওকে দেখতে আসা লোকদের নানা প্রশ্নের উত্তরে ও কিছুই বলত না, কেমন একটা বিভ্রান্ত হাসি মুখে ঝুলিয়ে রাখতকিন্তু একটু সুস্থ হবার পর যখন ও সামান্য চলাফেরা করে, বা বেডের উপর বসে থাকে, তখন লোকেরা এসে ওর কাছ থেকে জানতে চাইতো, কীভাবে কী ঘটেছিল। বার বার একই গল্প সবাইকে বলতে হতএবং এভাবেই একসময় বাঘ মারার কৃতিত্বটা ওর মধ্যে গ্যাঁট হয়ে বসে যতটা পারে গুছিয়ে সে লোকদের কথার উত্তর দিতো। শুনে কেউ বলল, তোমার তো ফটো তুলে কাগজে দেওয়া দরকারকেউ বলল, তোমাকে তো মেডেল দেওয়া উচিত। কেউ বলল বাগান থেকে নিশ্চয় অনেক কিছু দেবে তোমাকে? প্রতিটি প্রস্তাবেই তার মনে আশ্চর্য সব প্রত্যাশার বুড়বুড়ি উঠছিলআবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেই প্রত্যাশার বেলুন চুপসেও যাচ্ছিল, যখনই মনে পড়ছিল বাগানের গুঁফো ম্যানেজারের মুখটি। ওই বদরাগী ম্যানেজারটা হাসি হাসি মুখ করে সোমরাকে মেডেল পরিয়ে দিচ্ছে, এই দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। বাঘের মতোই হিংস্র মুখ ওর, বাঘের মতোই খাড়া খাড়া গোঁফ। লালচে রঙের চুলে আর গোঁফে ম্যানেজারটিকে অবাঙ্গালী মনে হলেও আসলে সে বাঙ্গালী, ভটচায। সোমরা তো সাহস করে ওকে কিছু বলতেই পারবে না। লোকদের কথার উত্তরে সোমরা অনিশ্চিত গলায় শুধু বলেছে, জানি না আইজ্ঞা। তবে হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে মেডেলের কথা ভাবতে ভাবতে মেডেলটা তার স্বপ্নে ঢুকে গেল 
বাগানের গাড়িতে করেই হাসপাতাল থেকে ফিরেছিল সোমরা। ফেরার পথে ওর বন্ধুরা গলা ফুলিয়ে চিৎকার দিচ্ছিল। রাস্তার লোকেরা ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিল। শহর ছাড়িয়ে বাগানের পরিবেশে ঢুকে পড়তে ওদের উল্লাসের মাত্রা বেড়ে গেল। যেন ফুটবল ম্যাচ জিতে ফিরছে বা যেন দুর্গাপূজার ভাসান থকে ফেরাওরা শ্লোগান দিচ্ছিল, হামদের সোমরা-জিন্দাবাদ। বাঘুয়া সোমরা-জিন্দাবাদ। পাতা ভর্তি ঝুড়ি পিঠে নিয়ে ফিরতে থাকা কামিনের দল উৎসুক চোখে তাকিয়ে একে অন্যকে বলছিল, কোনটা, হেই কোনটা, এঃ, আমি না-ই দেখলাম রে। অফিসের সামনে ট্র্যাক্টর থেকে নামলে কয়েকজন মিলে সোমরাকে কাঁধে তুলে নিল। সাড়া পেয়ে কাছাকাছি যারা ছিল তারাও এসে জুটল। নতুন একটা তামাশা পেয়ে ওদের মুখে হাসি আর ধরে না। বাচ্চারা চোখ পিটপিট করে একবার সোমরার দিকে তাকাচ্ছে, একবার অন্যদের দিকে, আর যে কোন কথার শেষেই একবার পটাপট হাততালি দিচ্ছে একটা হুলুস্থুলুর পরিবেশ সৃষ্টি হতে দেখে বড়বাবু বেরিয়ে এসে বললেন, এই, তোরা কী শুরু করেছিস এখানে? অফিস ঘরে চেঁচামেচি জুড়েছিস। সাহেবের কানে গেলে কিন্তু অবস্থা খারাপ হয়ে যাবেসবাই একটু দমে যায়। সাহেব মানে সেই গুঁফো ম্যানেজার। বাগানের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা। তাঁর নামে সকলেরই বুক কাঁপেওরা বোঝে এভাবে অফিস ঘরের সামনে চেঁচামেচি করাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে নাসোমরা শুধু একবার লাজুক হেসে বড়বাবুকে বলল, আইজ্ঞা, আমারে কিন্তু মেডেল দিবা একটা। আকাশ থেকে পড়া বড়বাবু চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করেন, কী? মেডেল? সমবেত ভিড় যেন এবার একটা নির্দিষ্ট দাবী হাতে পেয়ে মহা উৎসাহে সমস্বরে বলে ওঠে, মেডেল দেওয়া লাগব আইজ্ঞা। আবদারের সুরে বলা। তবে বড়বাবু টের পান এই আবদার নিয়ে এখন প্রশ্ন তুললে ভিড় সরবে না তাড়াতাড়ি। তাই তর্কে না গিয়ে উনি বলেন, ঠিক আছ, ঠিক আছে, পরে দেখবএখন যা, ভাগসমবেত জনতা এই কথাকেই আশ্বাস ভেবে আরেকবার উল্লাসে হৈ হৈ করে উঠল, বাচ্চারা আরেকবার হাততালি দিল। ভিড় এবার মিছিলের মত করে কুলি লাইনের দিকে রওয়ানা হয়কিন্তু সামনে আর কোনও তামাশা নেই অনুমান করে আস্তে আস্তে মিছিলের ল্যাজ ফাঁকা হতে থাকে
কুলি লাইনে পৌঁছে ওরা তখনকার মত যে যার বাড়ি চলে গিয়েছিল। কয়েকজন আবার রাতে একজোট হলবড়বাবুর কথার সুরে ওদের আত্মবিশ্বাস একটু টাল খেয়েছিল। এখন মদ খেয়ে সেই হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনল এবং যে যতটা পারে গলা তুলে মেডেলের দাবীটা নিজেদের মধ্যে ঝালিয়ে নিল। মেডেল জিনিষটা কেউ কেউ সিনেমায় দেখেছে। ঠিক নিশ্চিত নয় জিনিষটা সোনার, না রূপার, না কি টিনের দুর্গা পূজার ঢাকিদের পোশাক থেকেও মেডেল ঝুলতে দেখেছে ওরা। সে সব নিশ্চয়ই তেমন দামী নয়। ওরা সিদ্ধান্তে আসে যে রূপা বা টিনের মত সস্তা মেডেল থাকলেও বাঘ মারার মেডেল সোনারই হবে। যদি মেডেল সোনার হয়, তবে তার দাম কত হবে, কেউ কোনও আন্দাজ করতে পারে না। এরপর কথা উঠল, মেডেলটা সত্যি দেবে তো। বাবুদের কথায় ভরসা কিযদি না দেয়! মা কসম, বাপ কসম বলে ওরা নানা রকম পরিকল্পনা ছকে ফেলল। মেডেল না দিলে বাগানে ইস্ট্রাইক করে দেব। মেডেল না দিলে অফিসঘরের টিনের চালে পাত্থর মারবো মেডেল না দিলে ম্যানেজারের গাড়ির পাম্‌ ছেড়ে দেব। মেডেল না দিলে...
এমনিতে বাঘ মেরে বাগানে সোমরার খাতির বেড়ে গিয়েছিল অনেকবড়রা সবাই তারিফের চোখে তাকাত, পিঠ চাপড়ে দিতএমন কি বাবুরাও এখন ওকে দেখলে বলে, কীরে সোমরা। আগে বলত, এই, কী যেন নাম তোর। এমনিতে বাগানে সোমরা ও তার বন্ধুদের দলের একটা দাদাগিরি আছে। সেখানে ওদের চার পাঁচ জনের মধ্যে কেউ কারো কম নয়। তবে সারা বাগানের সমর্থন পেছনে এসে জুটেছে বলে বন্ধুরাও সোমরাকে একটা বাড়তি গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করে। কোনও ব্যাপারে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা পেলে ফয়সালা সোমরার উপর ছেড়ে দেয়। এভাবে এক অলিখিত নেতৃত্ব এসে গেল সোমরার মধ্যে। বাগানে সবাই ওর মধ্যে একটা বল, ভরসা খোঁজে। সোমরাও তাঁর বন্ধুদের নিয়ে, যতটা পারে সকলের নানা কাজে এগিয়ে যায়। মাঝরাতে অসুখ বিসুখ কি কারো বিয়ে শ্রাদ্ধে খাটা খাটুনি, সোমরাকে সবাই ডাকে। কিন্তু এত সব খাতির, নামডাকের পরেও একটা মেডেলের সাধ সে সযত্নে পুষে রেখেছেহাজার কাজ, হাজার ফুর্তিফার্তা, হল্লোড়বাজির মধ্যেও গোপনে সে একটা মেডেলের স্বপ্নে দিনরাত মশগুল।   
প্রথম প্রথম সোমরা ভাবতো বড়বাবু যখন বলেছেন, ব্যবস্থা কিছু একটা নিশ্চয় হবেতাড়া দেওয়ার কিছু নেইতলবের দিন অফিসে গেলে বড়বাবুর সাথে দেখা হত। সোমরা কান পর্যন্ত হাসি ছড়িয়ে তাকাতো, অপেক্ষা করত বড়বাবুর মুখ থেকে হয়তো মেডেলের খবর বেরোবে কিছু। বড়বাবু কখনও, কি রে, কেমন আছিস জাতীয় ভঙ্গীতে চোখ নাচাতেন শুধু। কখনও ওকে খেয়ালই করতেন না। দু তিন সপ্তাহ এভাবেই কাটে। বড়বাবু কিছুই বলেন না। তখন একদিন ও নিজেই গিয়ে বড়বাবুকে বলে, আইজ্ঞা, আমার মেডেলটা? বড়বাবু কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে জবাব দেবেন, ও, মেডেল? আচ্ছা, হবে যা। আবার  কিছুদিন পরে জিজ্ঞেস করলে বড়বাবু বলেন, আরে হ্যাঁ, তুই তো রাষ্ট্রপতির মেডেল পেয়েছিস, দেখি রাষ্ট্রপতি কবে আসেন। সোমরা ভাল করে না বুঝে বলেছে, আইজ্ঞা আইচ্চা। তারপর অন্যদের মুখে হাসি দেখে বুঝতে পেরেছে এটা মস্করা তারপর নিজেও বোকার মত হেসেছে। এভাবে কয়েকদিন নানা মস্করা সহ্য করে করে একদিন সোমরা দুপুর বেলাতেই মদ গিলে অফিসে এলো। এসে বড়বাবুকে ধরলো, আমার মেডেলটা দেইন আইজ্ঞা বড়বাবু অনেকক্ষণ একদৃষ্টে সোমরার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, তুই মদ খেয়ে এসেছিস, এখন বাড়ি যা। শুনে সোমরা আরও তড়পাতে লাগল। বড়বাবুর কথার একটা যুৎসই জবাব দেবার চেষ্টায় সে বলল, মদ খাইসি তো মদ খাইসি, কেউর বাপর মুত খাইসি নি। এবং এই কথাটি বলে তার মনে হল এটা খুব বিচক্ষণ জবাব হয়েছে। অন্তত তার অঙ্গভঙ্গিতে সেই রকমের আত্মতৃপ্তি দেখা গেলএবার বড়বাবু বিরক্ত হলেন। বললেন, এই, তুই আর আমার কাছে মেডেল মেডেল করিস না তো? কীসের মেডেল রে? জানিস বাঘ মারা বেআইনি? বাঘ মারলে জেল হয়, আর তুই এসেছিস মেডেল চাইতে? যা, সাহেবের কাছে যা। দেবে তোকে মেডেল।
এবার সোমরার চোয়াল ঝুলে গেলবাবু বলে কী? এতদিন দিচ্ছি দিচ্ছি বলে ঝুলিয়ে রেখে এখন উল্টো কথা শোনাচ্ছে। বাঘ এসে তাদের গরু খাবে, ছাগল খাবে, সুযোগ পেলে মানুষও উঠিয়ে নিয়ে যাবে। টিন পিটিয়ে বাঘ তাড়ানো চলবে। আর সেই বাঘ মারলে নাকি মানুষের হবে জেল? ওর মনে হয় এটাও বড়বাবুর মস্করা। তাই সে তার চেহারায় রাগের ভঙ্গী এবং গলায় রাগের সুর বজায় রেখেই জোর দিয়ে বলে, আইজ্ঞা আইচ্চা। তারপর বেরিয়ে এসে কী করবে ভেবে পায় না। মদ খাওয়া অবস্থায় বাবুদের সঙ্গে কথা বললে সোমরাদের ব্যবহারে আটক থাকে না। যে কোনও কথাই একটু বাড়তি জোর দিয়ে বলে মনে তৃপ্তি পায়, যেন খুব যুতমত একটা দামী কথা বলা হয়েছে আর এই করতে গিয়েই বাড়াবাড়ি হয়পরদিন অফিসে ডাক পড়ে। মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে গালাগাল শুনতে হয়। আবার মদ না খাওয়া অবস্থায় ওদের কেমন যেন কথা বলার সমস্ত কৌশল হারিয়ে যায়যত কিছু বলার থাকে, সব ঠিকঠাক গুছিয়ে এনেও বাবুদের পাল্টা জবাব শুনে সব চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায়। বাবুগুলোকে তখন বড় দুর্বোধ্য মনে হয়। তখন বাবুরা যা বলেন, সবই ওরা ‘আইজ্ঞা আইচ্চা’ বলে মেনে নেয়। বলার কথাটা আর ওদের ঠিকঠাক করে কোনও দিনও বলা হয়ে ওঠে না।
 বাড়াবাড়ি করে সেদিন সোমরা বড়বাবুর কাছে মেডেল নিয়ে দরবার করার সুযোগটাই হারিয়ে ফেললতার উপর বড়বাবুর মুখে যে কথা শুনলো, তাতে তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল, সত্যি কি বাঘ মারলে জেল হয়?
এই রকম সময় একদিন বাগানের মেয়ে লখিয়া আর বুধনী দারুণ একটা খবর আনল। ওরা দুজনে ম্যানেজারের বাংলোয় কাজ করে, ঘর মোছা, সাফ সাফাই-এর কাজওরা একদিন খবর আনলো, সাহেবের বৈঠকখানা ঘরের দেয়ালে একটা বাঘের চামড়া ঝুলছে, যেটা আগে ছিল নাচোখের যায়গায় মার্বলের গুলি বসানো, ঝক ঝক করছে একেবারেমুখটা হাঁ করা, দাঁত খিঁচানো, দেখলে বুক কাঁপে। মনে হয় বুঝি এক্ষুনি ঘ্রা-উ-উ বলে লাফিয়ে পড়বে পিঠে। শুনে সোমরা ভাবে, আমার বাঘটা! বাঘের চামড়াটা ম্যানেজারের ঘরে চলে যাওয়ার খবর কেউ কেউ জানে। কেমন দেখতে বাঘটা? সে তো দেখেও নি ভাল করেকিন্তু বাঘ মারা সত্যি সত্যি বে-আইনি হলে সাহেবের ঘরে বাঘের চামড়া ঝুলছে কি করে? ওর মনে হয়, এবার আর বড়বাবুর সাথে কথা না বলে সোজা সাহেবকেই বলবে। গিয়ে বলবে, এই আমি, আমি সোমরা ভূমিজ, বাঘটা আমিই মেরেছি আইজ্ঞা। বললে সাহেব নিশ্চয় তার জন্য মেডেলের ব্যবস্থা করবে। নিশ্চয় করবে।
কিন্তু সোমরা গিয়ে ম্যানেজারকে মেডেলের কথা বলার সাহস জোগাড় করার আগেই এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যে আমাদের রাধানাথপুর বাগানের নামটা একেবারে খবরের কাগজে উঠে গেল। কাগজে এই রকম লিখেছিল- রাধানাথপুর বাগানে শ্রমিক অসন্তোষ। ম্যানেজারের হাতে এক শ্রমিক রমণীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাধানাথপুর বাগানে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। খবরে প্রকাশ, দোষী ম্যানেজারের শাস্তি চেয়ে শ্রমিকেরা ম্যানেজারের বাংলো ঘেরাও করে রেখেছিল উত্তেজিত শ্রমিকরা ম্যানেজারের গাড়ীতে অগ্নি সংযোগ করে এবং পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে বাংলোরও প্রচুর ক্ষতিসাধন করে। পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেবাগানে এখনও টান টান উত্তেজনা বিরাজমান
সবাই সব কথা জানে না। তবে যে মহিলাটি মারা গেল তাকে সবাই চেনে। সে সোমরার পিসি, নাম এতোয়ারী। সেদিন লখিয়ার জায়গায় বদলী খাটতে গিয়েছিল এতোয়ারীকী নিয়ে ঝামেলা হল, ম্যানেজারের বাংলোর নেপালি দারোয়ান কেনই বা এতোয়ারীকে ধাক্কা দিতে দিতে ঘর থেকে বের করে আনছিল, কেনই বা সাহেবকে দেখে এতোয়ারী কথা বলতে গেল, কীইবা বলেছিল যে সাহেব রেগে মেগে রিভলভার খুলে গুলি করে বসলেন, এসবের কিছুই জানার উপায় নেই। সেদিন এতোয়ারীর সঙ্গে কাজে বুধনীও ছিল। তবে দুজন দু জায়গায়বুধনী জানিয়েছে, এতোয়ারীর কাজ ছিল বারান্দায়, ফুলের টবগুলো থেকে আগাছা সাফ করা, বারান্দা মোছা, এই সব। ও নাকি বৈঠকখানায় ঢুকেছিলঢুকলেই বা কী? কাজের জন্য ওরা তো ঢোকে ভেতরে। তাহলে এমন হতে পারে, বুধনী গল্পটা নিজের বুদ্ধিতেই সাজায়, বারান্দায় কাজ করতে করতে কোনও সময় পর্দা সরে গিয়ে এতোয়ারীর চোখে পড়েছে দেয়ালে টাঙানো বাঘছালটা। নিজের ভাইপোর হাতে মারা যাওয়া বাঘটাকে একটু ভালো করে দেখবার লোভে হয়তো এতোয়ারী ঘরে ঢোকে। তারপর সে কি বাঘটাকে হাত দিয়ে ছুঁয়েছিল? কেউ কি মানা করেছিল? জবাবে এতোয়ারী কী বলেছিল? এই সব জানা যায় না। কাগজে খবরটা পড়ে শহরের লোকেরা বলবে, নিশ্চয় চুরি টুরি করেছিল, নইলে একটা ম্যানেজার কি পাগল নাকি যে গুলি করে দেবে? বাগানের বাবুরা বলবে, কী আর বলব। সাহেবটার মাথা গরমকিন্তু তোদেরও তো সমঝে চলা দরকার ছিল। আর বাগানের শ্রমিকরা বলবে, উ ম্যানেজারটো সব পারে। রোদে বসে বন্দুক সাফাই করছিল, রাগ হতে গুলি মেরে দিল।
সারা বাগান যখন এই ঘটনায় উত্তাল, যখন বাচ্চা বুড়ো মেয়ে মরদ সবাই কুলী লাইন থেকে চারাবাড়ি থেকে মেশিন ঘর থেকে নার্সারি থেকে টিলা থেকে মাঠ থেকে কাতার দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ম্যানেজারের বাংলোর দিকে, সেই কাতারে সবাই সোমরাকে খুঁজেছিল। সোমরা তো বাগানের একজন বল ভরসা। খবর পেতে দেরী হয়নি ওর। খবরটা শুনে সেও এগোচ্ছিল। তারও মাথা মগজ জ্বলছিল। ম্যানেজারের বাংলোর গেটের সামনে তখন দেড় দুশো শ্রমিকের ভিড়। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা, বাবুরা, এমন কি সর্দারদেরও বয়স্ক কেউ কেউ ভিড় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল। সাহেবের বিশাল আকৃতির কালো আর বাদামীর মিশেল দেওয়া কুকুরটা গেটের বাইরের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করে লাফিয়ে উঠছে আর তার বকলেসে বাঁধা শেকল টেনে কুকুরটাকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে নেপালী দারোয়ানসোমরা এগিয়ে গিয়েও দূর থেকে ম্যানেজার আর বাবুদের দেখে কেমন সঙ্কোচে পড়ে যায়। হঠাৎ করে তার চোখের সামনে সরু লাল ফিতেয় লটকানো একটা মেডেল দুলতে থাকে। সোনার মেডেল। রোদে চকচক করছে। আলো ঠিকরে পড়ছে। চোখে ধন্দ লাগে সোমরার। পথভ্রান্ত হয় সে। মেডেলটা যে চিরকালের জন্য অধরা থেকে যাবে! মেডেলটা, সোনার মেডেলটা। এক অদ্ভুত দোটানায় কী করবে ভেবে না পেয়ে সোমরা নিজেকে আড়াল করে ফেলে। তারপর পেছোতে থাকে। লুকিয়ে পড়ে। একসময় তার সঙ্গীরা, বাগানের অন্য লোকেরা ওকে আর দেখতে পায় না। একটা মেডেলের স্বপ্নে সে তার রাজ্যপাট হারিয়ে ফেলে   
মেডেলটা সোমরা পেল নাসেদিন পুলিশ এসে গুঁফো ম্যানেজারকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাবার পর সে আর এই বাগানে ফিরে আসে নি। মেডেলের কথা আর কাউকে বলাই হয় নি। মেডেল পেলেও তার হয়ে তখন হাততালি দেবার কেউ ছিলা না বাগানে। সোমরার বয়স এখন ষাট পেরিয়েছে। সামনের চারটে দাঁত পড়ে গিয়ে তার মুখটা এখন ফোকলা, হাসলে জিভ দেখা যায়। মাথার ঝাঁকড়া চুল পেকে সাদা। মাঝে মাঝে সোমরা কুলি লাইন থেকে বেরিয়ে আসে। কখনও শীতের সকালে চাদরে শরীর পেঁচিয়ে সে রোদে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায়। কখনও কালো হাফ প্যান্টের সঙ্গে রংচটা টি শার্ট পরে কোনও শিরিষ গাছের তলায় এসে বসে কখনও গিয়ে বসে নিস্তলের ঝর্নার উপর কোনও পাথরে। প্রকৃতির শোভা দেখতে কেউ কেউ এই ঝর্নার দিকে আসে। সোমরা বসে বসে ওদেরে দেখে। আজকাল কেউ সোমরাকে দেখিয়ে বলে না, এ হল বাঘুয়া সর্দার, আমাদের সোমরা। এই লোকটা বাঘ মেরেছিল। সোমরা নিজেও কথাটা সারাক্ষণ বয়ে বেড়ায় না। কদাচিৎ কোনও বাচ্চা ছেলে বা মেয়ে বাপ কাকার কাছে শুনে ওকে জিজ্ঞেস করে, সোমরা বুড়ো, তুমি নাকি বাঘ মেরেছিলে? শুনলে বড় খুশী হয় সোমরাফোকলা হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে উত্তর দেয়, অয়, আইজ্ঞা।  সোমরার বন্ধুদেরও বয়স হয়েছে। রাতে কখনও দুচার জন বন্ধু বান্ধব একসাথে বসে মদ খেলে কেউ কেউ খুঁচিয়ে তোলে মেডেলের কথা। এত করেও মেডেলটা তুই পেলি না সোমরা। সোমরা তখন রাগে তার ঝাঁকড়া চুলওলা মাথাটা ভীষণ ঝাঁকাতে থাকে। তারপর অকারণেই চেঁচিয়ে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বাগানী বাংলায় বলে -লাগে না আমার মেডেল। তারার মেডেলর উপরে আমি মুতি!  
(আমাদের সমকাল, শিলচর, ২০১৪)

লেম



                                                   লেম  
                                                          মলয়কান্তি দে

          মাত্র তিনদিনের ছুটি নিয়ে করিমগঞ্জ গিয়েছিল উৎপল। পৈত্রিক বাড়ির ভাগ বাঁটোয়ারা সংক্রান্ত  ব্যাপার,  দাদা খবর দিয়েছিল একটু আলাপ আলোচনার দরকার আছে। কাজটা জরুরী। তাই এই তিনদিনের সময় বের করতেই হল। নইলে আজকাল আর করিমগঞ্জ যাওয়ার কথা ভাবতে পারেনা।  সময় বের করাই মুশকিল, তার ওপর রাস্তার যা অবস্থা, সব উৎসাহে জল ঢেলে দেয়। 

উৎপল আর নবারুণ চাকরিসুত্রে গৌহাটি এসে গৌহাটিরই বাসিন্দা হয়ে গেছে। দুজনেরই বাল্যকাল থেকে শুরু করে স্কুল জীবন, কলেজ জীবন, এমনকি চাকরি জীবনেরও অনেকখানি কেটেছে করিমগঞ্জে। দুজনেরই অজস্র স্মৃতি ছড়ানো ঐ শহরে। যেতে ইচ্ছে করলেও চট করে যাওয়া  হয়না। গেলেও খুব যে বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা হয় তা নয়। গৌহাটি হোক আর করিমগঞ্জ হোক, সবখানে সবাই নিজের নিজের রুটিনের জালে আটকা পড়ে গেছে। নিয়মিত কোনও আড্ডার অবকাশ আর নেই। তবু উৎপলদের মত ভিন শহরের বাসিন্দা হয়ে যাওয়া কেউ কেউ এলে, করিমগঞ্জের বন্ধুরাও একটু সময় বের করে নেয় আড্ডার। গৌহাটিতেও উৎপল নবারুণরা মাঝে মাঝে এর বা ওর বাড়িতে আড্ডায় বসে। তখন তাদের আলাপচারিতার অনেকখানি দখল করে রাখে করিমগঞ্জ। যাবার আগের দিন উৎপল নবারুণকে টেলিফোনে জানিয়েছিল, কাল যাচ্ছি করিমগঞ্জ। শুনে নবারুণ বলেছিল, বাঃ, যা, ঘুরে আয়। ফেরার পর আসিস।  করিমগঞ্জের গল্প শুনব।

এবারও বন্ধুদের সঙ্গে তেমন আড্ডার সুযোগ ছিলনা। জমি-বাড়ি সংক্রান্ত কথাবার্তার ফাঁকে দু-একজনের সাথে বড়োজোর দেখা করা যাবে, এমনটাই ভেবেছিল উৎপল। সেই মত করিমগঞ্জে পৌঁছনর দ্বিতীয় দিন, সন্ধ্যাবেলা তথাগতর বাড়ি গিয়েছিল। রাত ন’টা অবধি গল্প করে বাড়ি ফিরেছে। খাওয়া দাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে একটা লিটল ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিলকরিমগঞ্জ থেকে বেরোয় পত্রিকাটা, উৎপল আগে দেখেনি। পরিচিত দু-একজনের সাথে অনেক অপরিচিত লেখকের লেখা। রাত বারোটা নাগাদ আবার তথাগতর ফোন। ঘুমিয়ে পড়েছিলি ?

-      না, বল।
-      রাজর্ষির মা মারা গেছেন। 
-      সে কিরে, কখন?
-      এইতো, আধঘণ্টা হবে।

উৎপলরা তখন মাত্র কলেজে উঠেছে। আবিষ্কার করেছে বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা মারার আনন্দ। আড্ডা হত রাস্তাঘাটে, কলেজের গেটের সামনে, পানের দোকানের পাশে, বা মাঝে মাঝে, পকেট সায় দিলে পাড়ার চায়ের দোকানে। সিগারেটে টান দেবার আগে বড়ো বেশী এদিক ওদিক তাকাতে হত। সব সময় মনে হত এই বোধহয় বাড়ির কোনও গার্জেন, পাড়ার কোনও দাদা-কাকু-মেসো বা স্কুলের কোনও স্যার দেখে ফেললেন। দরকার পড়েছিল একটু নিভৃত একটা আড্ডার জায়গা। তখন রাজর্ষি জানাল ওর একখানা আলাদা ঘর আছে, যেখানে আড্ডা মারলে কেউ কিছু বলবে না। এবং সেটাও ছাদের উপরে। অনেক স্বাধীনভাবে হৈ হুল্লোড় করা যাবে । বৃষ্টি-বাদলার দিনে তো বটেই, এমনিতেও মাঝে মাঝে ওরা রাজর্ষির ঘরে আড্ডা জমাত। আরও পরে, যখন তাদের গোপন রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার জন্য দীর্ঘ সময়ের বৈঠকের দরকার পড়েছিল, তখন থেকে রাজর্ষির বাড়িটাই ওদের প্রায় ঠিকানা হয়ে ওঠে। যখন তখন চাইলেই চা করে দিতেন মাসীমা। আট কাপ, দশ কাপ।  দুপুর, বিকেল কিংবা রাত দশটাতেও মাসীমার কোনও ক্লান্তি ছিলনা। কখনও আবার সঙ্গে মুড়ি-মাখা, কোনও দিন ফুলুরি। কখনও রাত বারোটায় রাজর্ষি বাড়ি ফিরেছে, সঙ্গে বন্ধুদের এক দুজন, রাজর্ষি মাসীমাকে বলেছে ওর ভাত সবাইকে ভাগ করে দিতে। মাসীমা ঐ মাঝরাতে কিছু না কিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এবং সবাই মোটামুটি ভরপেট খেতে পেয়েছে । হয়ত ওঁর নিজের ভাতও ভাগ করে দিয়েছেন। ছেলের বন্ধুদের সবাইকে নামে চিনতেন। পরে যখন জীবিকার ধাক্কায় কেউ কেউ করিমগঞ্জ ছেড়ে কোনও দূর শহরের বাসিন্দা হয়ে গেছে, একজন কারো সঙ্গে দেখা হলে অন্যদেরও খোঁজ নিতেন। কয়েক বছর আগে একবার উৎপল দেখা করতে গেলে বললেন, তোর ছেলে তো এবার ক্লাস নাইন হল বোধহয়। উৎপল অবাক হয়ে গিয়েছিল। সেই মাসীমা মারা গেছেন। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। তথাগতকে জিজ্ঞেস করল, শ্মশানে যাবি তো তোরা, ক’টা নাগাদ যাওয়া হবে জানিস কিছু ? তথাগত জানায়, আত্মীয়স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করতে হবে,  সব কিছুর জোগাড় যন্ত্র করতে হবে। আলো ফোটার পরেই বেরোনো ঠিক হয়েছে। আমরা কজন চলে যাব একটু পরে, তুই বরং ভোর ভোর সোজা শ্মশানে চলে আয়। উৎপলের খুব ইচ্ছে করছিল এক্ষুনি তথাগতদের সঙ্গে বেরোতে। মাসীমার শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাবে এটা সুদূর কল্পনাতেও ছিলনা। সুযোগ যখন পাওয়া গেল, না যাওয়ার  মানে হয়না। কিন্তু সবদিক ভেবে তথাগতর পরামর্শটাই সঙ্গত মনে হল। পরদিন রাতের বাসে ও গৌহাটি ফিরবে। ঘুম হবে না। গৌহাটি পৌঁছে সেদিনই আবার অফিস। আজকের রাতটা পুরো জাগলে ধকল বেশী হয়ে যাবে।  

মাসীমার কাছে নানা ব্যাপারেই উৎপল আর তার বন্ধুরা ঋণী । শুয়ে শুয়ে আজ আবারও মাসীমাকে কৃতজ্ঞতা জানাল উৎপল। পুরনো বন্ধুদের অনেকের সাথেই আজ দেখা হয়ে যাবে, যাদের সাথে হয়তো গত পনেরো কুড়ি বছর বা তারও বেশী সময় ধরে দেখা হয়নি। মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা টের পাচ্ছিল সেঘুমোবার চেষ্টার মধ্য দিয়ে রাত কাটল এবং এক সময় অন্ধকার সামান্য ফিকে হতেই মুখে চোখে জল দিয়ে তৈরি হয়ে রাস্তায় বেরোল । এবড়ো খেবড়ো ভাঙ্গা রাস্তা, কত দিন সংস্কার নেই কে জানে। তবু অভ্যস্তের মত পা চালালো উৎপল। নভেম্বরের মাত্র শুরু। কিন্তু বেশ জাঁকিয়ে কুয়াশা পড়েছে। অন্যমনস্কভাবে হেঁটে এক সময় নদীর পাড়ের বস্তির কাছাকাছি পৌঁছয় উৎপল এবং পুরনো অভ্যাসে বস্তির ভেতরকার সরু পায়ে চলা পথটার দিকে এগোতে গিয়েও থেমে গেল বস্তির ভেতর দিয়ে শর্ট-কাট হয়, নইলে পিচ রাস্তা ধরে অনেকটা পথ ঘুরে তবে শ্মশানে পৌঁছনো যাবে। কিন্তু আজ এতগুলো বছরের পর এই বস্তির রাস্তায় পা ফেলতে উৎপলের সঙ্কোচ হচ্ছে 

বস্তির ভেতর রাস্তা বলতে এর বাড়ির উঠোনের মধ্য দিয়ে তার বাড়ির পুঁই মাচার তলা দিয়ে ওর বাড়ির জানালা ঘেঁষে চলে যাওয়া। এক সময় এই বস্তির ভেতর উৎপলদের চলাফেরা এতই স্বাভাবিক ছিল যে  হেঁটে গেলে কেউই কৌতূহল দেখাত না। কিন্তু আজ পা বাড়াতে গিয়েও সঙ্কোচে দাঁড়িয়ে পড়েছে উৎপল। এই রকম প্রায় অন্ধকার ভোরে বস্তির ভেতর ঢোকাটা ঠিক কাজ হবে না হঠাৎ করে কার না কার চোখে পড়ে যাবে, হয়তো অচেনা কেউ। এমন কি চেনা কেউ হলেও এত বছর পর এই অস্পষ্ট আলোয় ওকে না ও চিনতে পারে। সতর্ক উৎপল পিচ রাস্তা দিয়েই হাঁটে।  

শহরের একেবারে শেষ সীমায়, কুশিয়ারা নদীর পাড়-ঘেঁষা ঐ এলাকাটায় কিছু গরীব আর নিম্নবিত্ত মানুষের বসতি। একসময় ঐ সব মুটে-মজুর রিক্সা-ওলা, ঠেলাওলাদের মধ্যে সংগঠন গড়ার কাজে লেগেছিল উৎপল, নবারুণ, তথাগতরা। সংগঠনটা অবশ্য মূলত: নবারুণের তৈরি। কিন্তু উৎপল বা তথাগতর নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল। ওখানেই এক বাড়িতে সারা রাত মিটিং করার পর ভোরের দিকে পুলিশ ওদেরে ঘিরে ফেলে। উৎপলরা পালিয়ে যেতে পেরেছিল কারণ এ পাড়ার অলিগলি ওরা যত জানে, পুলিশ ততটা জানত না। তাছাড়া, এলাকার লোকেরা পুলিশকে সহযোগিতা করেনি। দিন পনেরো পরে নবারুণ শিলচরে এক সমর্থকের বাড়ি থেকে ধরা পড়ে। নবারুণকে পুলিশ কতটা টর্চার করেছে, মার খেয়ে নবারুণ কতটা কি কনফেস করেছে, জানার উপায় ছিলনা। তাই উৎপলরা প্রায় দুবছর গা ঢাকা দিয়ে থাকেপরে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে গেলে শহরে ফিরলেও তখন ওরা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া পড়াশোনা শেষ করা ও চাকরি খোঁজার কাজে ব্যস্ত। রাজনীতি যেটুকু করতো সেটা ছাত্র এবং মধ্যবিত্তদের মধ্যে। এই পাড়ার লোকগুলোর সাথে যোগাযোগ তখনই কমে যেতে থাকে। বস্তিতে যাওয়া হত না। লোকগুলোর সঙ্গে এখানে সেখানে দেখা হত। কথাবার্তা হত। পরিচয়টা হারিয়ে না গেলেও ফিকে হয়ে আসছিল। কিন্তু চাকরি বাকরিতে ঢুকে পড়ার পরে আর যোগাযোগ থাকেই নি। লোকগুলোর কারা কারা বেঁচে আছে, কে কী করছে, কিছুই জানেনা উৎপল। আজ এত বছর পর এ পাড়ার কাছাকাছি এসে অনেকের কথাই মনে পড়ছে, উৎপল মনে মনে ভাবল, সুযোগ পেলে আজ একবার সকলের খোঁজ নেবে।  

ঘুরপথে এসেও অন্যদের থেকে আগেই শ্মশানে পৌঁছে গেল উৎপল। শ্মশানের দিকে তাকিয়ে ওর তাক লেগে গেল। ওর চেনা শ্মশানটা ছিল বাঁধ পার হয়ে নদীর পাড় ঘেঁষে শুধুমাত্র একটুকরো সমতল জমি, পাকা কোনও চুল্লী ছিলনা, লোকেরা ফাঁকা জায়গা খুঁজে চিতা সাজাত। পোড়া কাঠ পড়ে থাকত নদীর ঢালে, যতদিন না জল বেড়ে সব কিছু ধুয়ে নিয়ে যায়। কোনও বেড়া বা পাঁচিল দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করা ছিলনা।  শ্মশানের অপরিহার্য অঙ্গ যে কালী মন্দির, সেটাও ছিল একটু তফাতে, বাঁধের এদিকে। কালীমন্দিরে কোনও  নিত্যপূজার ব্যবস্থা  ছিল না, কোনও পরিচালনা ব্যবস্থাও ছিলনা, তবু অন্তত:  সন্ধ্যাবেলা দু-একটা প্রদীপ কেউ জ্বালিয়ে দিত। । শ্মশানের তাও ছিলনা। সেই শ্মশান এখন স্থানীয় এমপি না এমএলএর ফান্ডের টাকায় একেবারে সেজে গুজে রূপসী হয়ে আছে। পাকা চুল্লী হয়েছে দুটো, চুল্লীর নীচে থেকে পাকা ড্রেন, যাতে দাহ শেষ করে জল ঢেলে দিলে আর কোনও আবর্জনা উপরে জমে থাকবেনা। চারদিকে পাকা দেয়াল তোলা হয়েছে। দেয়ালের পাশ ঘেঁষে সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চের সারি। একপাশে একটা টিনের চাল দেওয়া পাকা ঘর, বৃষ্টিবাদলার কথা ভেবে। কয়েকটা লাইট-পোস্টও আছে। রাত করে যারা আসবে তাদের সুবিধার জন্য। এখন অবশ্য কোনও লাইট জ্বলছে না। পুরো জায়গাটা তাই কুয়াশা মেখে ভুতুড়ে হয়ে আছে। সামনেই কুশিয়ারা। কত বছর পরে কুশিয়ারা নদীর তীরে এসে দাঁড়িয়েছে উৎপল। ওপারে কুয়াশায় ঢাকা বাংলাদেশ –উৎপলের মনে হল হঠাৎ যেন বিগত জন্মের কোনও দৃশ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। দূরে হরিবোল শোনা গেল। রাজর্ষিরা আসছে।

          আধঘণ্টার মধ্যে শ্মশান চত্বর সরগরম হয়ে উঠলো। এক দল চিতা সাজাতে লেগে গেছে। কেউ  রাজর্ষিদেরে তৈরি করছে মুখাগ্নির জন্য। ভোর ভোর ভাবটা একটু তাড়াতাড়িই কেটে গিয়ে একটা ব্যস্ত  সকাল এসে জায়গা করে নিলউৎপল একবার গিয়ে খাটে শোয়ানো মাসীমার মুখের দিকে তাকালো। অনেক বুড়িয়ে গিয়েছিলেন। বয়স বোধ হয় নব্বই ছাড়িয়েছিল।  কয়েক পলক গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আস্তে আস্তে সেই জায়গা থেকে সরে আসে উৎপল। একটু দূরে বন্ধুদের একটা গুলতানি চলছিল। এর মধ্যে অনেকের সাথেই ওর দেখা হয়ে গেছে। কবে এলি, কেমন আছিস, এই সব তথ্য বিনিময়ের ফাঁকে প্রায় সবার গলায় একটাই অনুযোগ। তোরা তো ভাই করিমগঞ্জ ছেড়েই দিলি। ভালই করেছিস। এই তো রাস্তাঘাট, কারেন্টের অবস্থাও দেখেছিস।  কোনও দিকে কোনও ডেভলাপমেন্ট নেই। গৌহাটি যেতে মিনিমাম চৌদ্দ ঘণ্টা, কখনও সেটা  চব্বিশ ঘণ্টাও হয়ে যায়। তার মাঝে কোথাও আটকা পড়লে তো আর হয়েই গেল।

           বন্ধুদের সঙ্গে ঘাসের উপর বসে গল্প করতে করতে উৎপল চারদিকে চোখ বুলাচ্ছিল। চিতা এখন প্রবল পরাক্রমে জ্বলছে, ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে উঠছে। উৎপল এবার উঠে তথাগতর দিকে ইশারা করে বাঁধের দিকে এগোয়। তথাগতও উঠে এসে ওর সঙ্গ নিয়েছে। বাঁধ বলতে আসলে একটা পাকা দশ ইঞ্চি ইটের দেয়াল। দু-পাশে মাটি ফেলে ঠেকা দেওয়া। দেয়ালের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়, একের পিছনে এক। আগু পাছু করে ওরা দুজন এগোচ্ছিল। বাঁধের পাশ থেকেই বস্তির শুরু। একটু এগিয়ে উৎপল দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখাদেখি তথাগতও দাঁড়াল। উৎপলের দৃষ্টি অনুসরণ করে তথাগতও চোখ রাখে আলকাতরা মাখানো টিনের চালের ঘরটার দিকে। তারপর হেসে বলে, মনে পড়ছে ? উৎপলও হাসে। তারপর জিজ্ঞেস করে, বীরেন্দ্র কি করে এখন ? কী আর করবে, রিকসাই চালাচ্ছে হয়ত। তবে ঠিকঠাক বলতে পারবনা। দেখিও নি অনেকদিন। আরও একটু এগিয়ে বাঁধের উপর থেকে বস্তিটাকে কিছুক্ষণ দেখল ওরা। তারপর বাঁধ থেকে নেমে বস্তির আনাচে কানাচে হাঁটল কিছুক্ষণএখন আর বস্তি ঘুমন্ত নেই। সবাই কাজে কর্মে ব্যস্ত হয়ে আছে। যে কজনের মুখোমুখি হল ওরা, প্রায় সবাই বাচ্চা কাচ্চা আর কম বয়সী বৌ। তারা কেউ ওদেরে চিনতে পারল না। যারা চিনতে পারত ওরা হয়ত কাজে বেরিয়ে গেছে। বস্তির চেহারা বলতে গেলে একই আছে। বীরেন্দ্রদের ঘরটা আরও একটু জীর্ণ হয়েছে, দু-একজনের ঘর আবার পাকাও হয়েছে। এভাবে বাইরে থেকে বস্তিটাকে দেখে ওরা ফিরে আসে।

এবার আর বন্ধুদের গুলতানিতে যোগ না দিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে নানা ব্যাপারে কথা বলতে বলতে এদিক ওদিক হাঁটে এবং এক সময় চিতার কাছাকাছি পৌঁছয়। ছোটখাটো চেহারার একটি ছেলেকে অনেকক্ষণ ধরে উৎপল দেখছিল, পরনে লাল সালুর একটা টুকরো, পাকা হাতে লম্বা বাঁশ দিয়ে চিতাটাকে এদিকে ওদিকে খুঁচিয়ে দিচ্ছে। কখনো দু এক টুকরো কাঠ তুলে দিচ্ছে চিতায়। দূর থেকে কোনও সাধু টাধু ভেবেছিল, কাছাকাছি হতে দেখলো ছেলেটা মুখ চেনা। ঐ বস্তিরই হবে। নাম টাম মনে পড়ছে না। ছেলেটাও মুখ তুলে উৎপলকে দেখে হাসল। ভাল আছ উৎপল দা ? আগেই দেখেছি তোমাকে, কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। উৎপলের ঠিক মনে পড়ল না, আগে কখনও ছেলেটি এভাবে তাকে দাদা বলে ডেকেছে কি না, বা এভাবে কথা বলেছে কি না। তবু হাসিমুখে বলল, ভাল আছিরে, তুই কেমন আছিস? এইতো চলে যাচ্ছে। ছেলেটা কথা বলার সময় দরকারের চেয়ে বেশী মাথা ঝাঁকায়, যেন বলার  আগেই সব বুঝে গেছে। একটু এগিয়ে উৎপল চাপা গলায় তথাগতকে বলে, ছেলেটাকে চিনি কিন্তু নাম মনে করতে পারছি না। তথাগত বলল, ওই বস্তিরই হবে। আমারও মুখ-চেনা লাগছে। 

চিতার আগুনের আড়ালে ধীরে ধীরে স্মৃতি হয়ে যাচ্ছিলেন মাসীমা । দাহকার্য শেষ হতে বাকী নেই  বুঝতে পেরে সবাই চিতার কাছে জড়ো হচ্ছে এখন। ক্রিয়াকর্ম শেষ হলে কলস ভরে ভরে জল এনে চিতা শান্ত করা হল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখছে এই সময় লাল সালু পরা ছেলেটা উৎপলকে ডাকল, উৎপল দা-উৎপল তাকালে আগের মতই মাথা ঝাঁকিয়ে  বলল, একটু এসো এদিকে। ছেলেটার ডাকার মধ্যে কথার তুলনায় ইশারার প্রাধান্য দেখে উৎপলের হাসি পাচ্ছিল। আরও খেয়াল করল, ছেলেটা যার সঙ্গে কথা বলছে তার চোখের দিকে যতটা তাকায়, তার থেকে বেশী তাকায় এদিক-ওদিকে। মনে মনে সামান্য বিরক্ত হলেও কৌতূহলে ছেলেটার পিছন পিছন উৎপল এগিয়ে গেল পাকা ঘরটার দিকে। ঘরটার কোনও দিকে কোনও দেয়াল নেই, চার দিকেই সিমেন্টের বেঞ্চের মত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আসা যাওয়ার জায়গা রেখে। উপরে ঢেউটিনের চাল। উৎপল দেখল, একদিকের বেঞ্চের উপর একটা ছোট কাঠের টুকরোর উপর লাল কাপড়ের টুকরো পেতে তার ওপর বসানো হয়েছে কালীর একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। ছবির নীচের দিকটা সিঁদুর লেপটানো, সামনে কয়েকটি বাসি ফুল। আর তার পাশে স্টিলের একটা ছোট থালা। ছেলেটা নানা কথা বলে যাচ্ছে। গৌহাটিতেই তো থাকো। ভাল, ভাল। বৌদি,  বাচ্চা কাচ্চারাও সেখানেই? খুব ভাল। নবারুণ-দাও তো গৌহাটিতে। খুব ভাল। এই সব বকবকানির মধ্যে আগের মতই একবার এদিকে, একবার ওদিকে এবং তার মধ্যে একবার উৎপলের দিকে তাকিয়ে স্টিলের থালার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, আমার কালীকে কিছু দাও। যা তোমার ইচ্ছে। উৎপল কিছুটা বিরক্ত হলেও বাক্য ব্যয় না করে পার্স বের করলো। মনে মনে দশ না পঞ্চাশ দশ না পঞ্চাশ জপে শেষ পর্যন্ত একটা দশ টাকার নোট স্টিলের থালায় রাখল। কালীর ছবিতে প্রণাম টনাম করল না। ছেলেটা আগের মতই অনেকবার মাথা নেড়ে  বলল ঠিক আছে, ঠিক আছে। দশ টাকায় খুশী হল কি না বোঝা গেল না। ওর বকবকানি একই মাত্রায় চলছে। তুমি, নবারুণ-দা, তোমরা সবাই কোথায় উঠে গেছ, আমি তো যে লেম সেই লেমই রয়ে গেলাম। ছেলেটা কি বলছে ঠিক ধরতে না পেরে উৎপল এমনি হাসি হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকদিন পর লেম শব্দটা শুনতে পেল। আজকাল কেউ কি লেম, অর্থাৎ কুপি বা লম্ফ জ্বালায় ? কে জানে। উৎপল এবার ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করে,

-      এখানে পূজো কে দেয় ?
সেই একই ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে ছেলেটা বলে,
-      তিন-বেলা মায়ের সেবা করি। শ্মশান যাত্রীরা দক্ষিণা টক্ষিনা দেন।
-      বাড়িতে কে কে আছে রে তোর ? উৎপল প্রশ্নটা না করে পারেনা।
-      বাবা তো মারা গেছেন। মা আছেন।  বউ ছেলে মেয়ে আছে। 
-      রুজি রোজগার কি করিস, মানে অনেকদিন পরে দেখা তো, সব খবর জানিনা।
-      রুজি আর কোথায়। করি এটা সেটা, যখন যা পাই।
-      কিছু মনে করিস না, তোর নামটা কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছিনা।
-      আরে আমি তো হারান। ভুলে গেলে ? সেই যে তোমরা পালিয়েছিলে, পুলিশ তো আমাদেরেই নিয়ে থানায় পুরল।

এবার উৎপল পূর্ণ দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকায়। দেখতে ছোটখাটো হলেও ভাল করে তাকিয়ে উৎপল বুঝে, দড়ি পাকানো চেহারা, চল্লিশের বেশীই হবে বয়স। এই ছেলেটির সাথে কোন রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল বলে মনে পড়ছে না। এমনকি কথাবার্তাও সে-ভাবে হয়ে থাকলে মনে পড়ত। বিশেষ করে ওর কথা বলার আলাদা ভঙ্গীর জন্য। উৎপলের স্মৃতিশক্তি এখনও নির্ভরযোগ্য এটা সবাই স্বীকার করে । কিন্তু চেহারাটা এত পরিচিত, সকলের নাম জানে, এমনকি কারা কারা গৌহাটি থাকে তা ও জানে। আবার বলল পুলিশ ধরেছিল । উৎপল কোন সমাধানে আসতে পারেনা। ছেলেটার কথায় কি কোনও অভিযোগের সুর আছে ? কোনও অনুযোগ ? ঠিক বোঝা গেল না। তবে এখন মনে হচ্ছে দশ টাকার নোট দেওয়াটা একটু বেশী তাচ্ছিল্য হয়ে গেছে। একবার ভাবল আরো কিছু টাকা ছেলেটার হাতে গুঁজে দেয়। কিন্তু সঙ্কোচে আটকাচ্ছিল। নিজের ব্যবহারে নিজেই বিরক্ত হয় উৎপল।

তথাগত ডাকছিল। শ্মশান যাত্রীরা এবার ফিরছে। উৎপল বলল, চলিরে, পরে দেখা হবে। ছেলেটা আগের মতই অনেক বেশী মাথা নাচিয়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাও। কতদিন পরে দেখলাম।

গৌহাটি ফেরার পর উৎপল তার রুটিনে ঢুকে পড়ে। অফিসের ব্যস্ততা, ছেলের পড়াশোনা সংক্রান্ত দৌড় ঝাঁপ, স্ত্রীর ডাক্তার দেখানো ইত্যাদি কাজে দিন যেতে থাকে যেমন যায়। এরই মধ্যে একদিন নবারুণের বাড়ী গেল, যেমন মাঝে মাঝে সময় করে যায়। রাজর্ষির মায়ের কথা উঠল। করিমগঞ্জের কথা উঠল। কিছুক্ষণ নানা প্রসঙ্গে কথা চালাচালি হল। নবারুণের স্ত্রী চায়ের সঙ্গে গরম পকোড়া ভেজে আনল ।  উৎপল বলল, পকোড়াগুলো পরে খাব, একটু গরম করে দিও। উৎপলের স্ত্রী বলল,

-      বুঝতে পেরেছি তোমাদের প্ল্যান। যা করবে তাড়াতাড়ি কর। বাবাই একা আছে। দেরী করলে চলবে না।

একটু পরে গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে দু একটা চুমুক দেবার পর দুজনেই যেন টের পেল, কথাবার্তায় এবার জুত আসছে।

ফিরে আসার পর হারানের কথা খুব একটা মাথায় ছিলনা। আজ করিমগঞ্জের গল্প করতে করতে  হঠাৎ মনে পড়ায় উৎপল নবারুণকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছারে, শ্মশানে একটা ছেলের সাথে দেখা হল। ছেলে মানে দেখতে ছোটখাটো, কিন্তু বয়স এখন চল্লিশ বিয়াল্লিশ হবে। নাম বলল হারানআমাদের সবাইকে চেনে। তোর কথাও বলল। মুখ চেনা মনে হচ্ছিল কিন্তু তার বেশী কিছু মনে পড়ল না। ওকে নাকি পুলিশ ধরেছিল, ঐ ঘটনার কানেকশনে। মনে করতে পারছিস, হারান নামের কাউকে? আমার মনে হল, বীরেনদা-দের বস্তিরই হবে। হারান ? নবারুণ স্মৃতি হাতড়ায়। দেখতে কেমন বলত ? কালো, ছোটখাটো চেহারা, কথা বলতে খুব মাথা নাচায়। ডান চোখের ভুরুর ওপর একটা কাটা দাগ আছে, ছোটবেলায় কেটে ফেটে গিয়েছিল হয়ত। নবারুণ হারান নামের এমন কাউকে মনে করতে পারেনা। জিজ্ঞেস করে – কোন প্রসঙ্গে এসব কথা উঠল ? উৎপল তখন ওকে পুরো ব্যাপারটা বলে। তাকানোর ভঙ্গী, মাথা ঝাঁকানোর ভঙ্গী, ফ্রেমে বাঁধানো কালী, এমন কি লেম শব্দটি পর্যন্ত। কিন্তু নবারুণ নামে-মানুষে এক করতে পারেনা। বলে, দেখলে অবশ্যই চিনব। ঐ পাড়ার ছেলে হলে চিনব না তা হতে পারেনা।   

-      আসলে ছেলেটার কথার মধ্যে কোনও অভিযোগ ছিল না হয়ত । তবে কেমন খারাপ লাগছিল। আচ্ছা, শুনেছিলাম আমাদেরে ধরতে না পেরে পুলিশ ঐ বস্তির কিছু লোককে উঠিয়ে নিয়ে যায়, কাদেরে সেটা জেনেছিলি তুই ?  

-      জেনেছিলাম। মানে খবর পেয়েছিলাম। বীরেন্দ্রকে ধরেছিল, ওর ঘরে আমাদের থাকার নানা চিহ্ন ছড়িয়ে ছিল। বীরেন্দ্র তো আমাদের সঙ্গেই পালিয়েছিল। ওর কাছে টাকা পয়সা কিছুই ছিলনা।  বীরেন্দ্র বেচারা বাসেই উঠতে পারেনি। ওকে তো বাস-স্ট্যান্ড থেকেই ধরেছিল। একটা চায়ের দোকানের পিছন দিকে ঘাপটি মেরে ছিল, আমাদের কাউকে পেলে টাকা চেয়ে নিয়ে বাসে উঠবে। কার্তিক নামের একটা ছেলেকেও ধরেছিল। পুলিশ ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমরা কোনদিকে পালিয়েছি। ও বলেছিল দেখেনি। পুলিশ সন্দেহ করেছিল ও জেনেও মিথ্যে বলেছে।  এ ছাড়া আরও দুজনকে ধরেছিল যাদেরে আমি নাম শুনে ঠিক চিনতে পারিনি তখন। হয়তো তেমন পরিচয় ছিলনা। এখন আর মনে পড়ছে না তাদের কারো নাম হারান ছিল কি না। কবেকার কথা। তবে কারো এগেন্‌স্টে স্পেসিফিক চার্জ কিছু ফ্রেম করেনি। একটু আধটু পিটিয়ে বুঝে গেছে এরা আমাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু খবর দিতে পারবেনা। কেবল বীরেন্দ্রকেই বোধ হয় মাস চারেক রেখেছিল।

-      তাহলে হতে পারে এই ছেলেটাও অ্যারেস্ট হয়েছিল।

-      আচ্ছা, ছেলেটাকে কেমন বুঝলি, মানে, বোধ-বুদ্ধি কেমন ? রাজনৈতিক কথাবার্তা বোঝার মত ছেলে ?

-      আরে না। একেবারেই বোদা-মার্কা।

-      তাহলে হয়ত মাঝে মাঝে সিগারেট বা খৈনি আনতে পাঠাতাম। বা চা করে দিতে বলতাম । নাকি রিক্সা টিক্সা চালাত ? ঐ বস্তির অনেক ছেলে রিক্সা চালাত এবং আমাদেরে রাস্তায় পেলে কথা বলত।

-      হতেও পারে।

এবার ওরা মদ্যপানে মনোযোগ দেয় এবং টুকটাক নানা বিষয়ে কথা বলতে থাকে। রাজ্য-রাজনীতির শেষতম রসিকতা থকে শুরু করে সম্প্রতি রিলিজ করা সিনেমা, নতুন কোনও শারীরিক সমস্যা এবং বাসে হঠাৎ স্কুল জীবনের এক ক্লাসমেটের সাথে এত বছর পরে দেখা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ আসে এবং চলে যায়। কিন্তু নবারুণ হঠাৎ আগের কথার খেই ধরে বলে,

-      ঐ ছেলেটা যে বলল, তোমরা সবাই কোথায় উঠে গেছ, আমি সেই লেম রয়ে গেলাম, তাতে কী  মনে হচ্ছিল ? মানে, ওর কি এমন কোনও ফিলিং আছে যে আমরা ওকে, বা ওদেরে ঠকিয়েছি ? ধোঁকা দিয়েছি ? বা ব্যাবহার করেছি ?   

-      ওর কথায় কোনও ঝাঁজ ছিলনা। ইন ফ্যাক্ট ছেলেটাকে আলাদা করে মনে রাখার মত কোনও ব্যাপার ছিলনা। ওই অ্যারেস্ট হওয়াটা ছাড়া। কিন্তু ওর ঐ কালী-সাধকের বেশ ভূষা, তারপর ঐ ফ্রেমে বাঁধানো কালী, বাসী ফুল – এসব দেখে ওকে আমার কেমন যেন গল্পের চরিত্র মনে হচ্ছিল। তাই মনে থেকে গেছে। 

-      জানিনা ছেলেটা কে। তবে কিছু লোক আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা হিসেবে এই রকমের কিছু কথা বলে বেড়ায়। বিশেষ করে যারা একসময় আমাদের সঙ্গে ছিল, তাদেরে বোঝায়, দেখ, একসঙ্গে রাজনীতি করলে, আর আজ ওরা কোথায় আর তোমরা কোথায় । সেই জন্য জিজ্ঞেস করছি, তোর  তেমন কিছু মনে হয়নি?

-      আমিতো সেরকম কিছু বুঝলাম না। ইন ফ্যাক্ট, ঐ লোকগুলোর কথা ভাবলে আমার একটা অপরাধ-বোধ হয়। আসলে দেখ, আমরাও এক সময় যথেষ্ট খারাপ অবস্থায় ছিলাম। দু একজনকে বাদ দিলে আমাদের কেউই ধনীর ছেলে নই। আমাদের ছোটবেলা এমনকি কলেজ জীবন অনেক কষ্টেসৃষ্টে কেটেছে। রাজনৈতিকভাবে একসময় আমরা জেনেছিলাম আমাদের এবং আমাদের মত আরও বহু বহু লোকের দারিদ্র্যের জন্য দায়ী এই সিস্টেম। এবং এই সিস্টেমকে পালটাবার জন্য ওই লোকগুলোকেও ডেকে নিয়েছিলাম সঙ্গে, বুঝিয়েছিলাম, একমাত্র লড়াই করেই আমাদের অবস্থা পাল্টানো সম্ভব। অবস্থা পাল্টানোর আশায় লোকগুলো আমাদের সঙ্গী হয়েছিল। অনেক কষ্টও স্বীকার করেছে। সিস্টেম সেই একই জায়গায় রয়ে গিয়েছে। ঐ লোকগুলো, যারা একেবারে দিন আনা দিন খাওয়া অবস্থায় ছিল, তাদের অবস্থার বিন্দুমাত্র উন্নতি তো হয়ই নি, অনেকের অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। আমরা কিন্তু আগের তুলনায় দিব্যি ভাল জায়গায় পৌঁছে গেছি। ভাল চাকরি বাকরি করি, বাড়ি গাড়ী আছে, আমাদের ছেলে-মেয়েরা ভালো স্কুলে পড়ে, দামী কাপড় পরে, আমরা মলে কেনাকাটা করি, মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখি। যে সিস্টেমকে পালটাব বলেছিলাম, কোনও না কোনও ভাবে আমরা যেন ঐ সিস্টেমের অংশ হয়ে গেছি। ঐ লোকগুলো তো আমাদেরে হিংসে করতেই পারে। অথচ দেখা হলে ওদের বেশীর ভাগ লোকই নিজের দুরবস্থার কথা বলেও কোনও টাকা পয়সা চায় না। নিজের থেকে দিতে গেলে সঙ্কোচে পড়ে যায়। দু একটা লুম্পেনের কথা বাদ দে। এই লোকগুলোর কথা ভাবলে আমার নিজেকে বড়ো স্বার্থপর মনে হয়।

-      এখানে স্বার্থপরতার কি আছে ? আমরা একটা আন্দোলন গড়তে চেয়েছিলাম। সেটা সফল হলে ওদেরও ভাল হত। সফল হয়নি, তার দায়ভাগ সবাই মিলে নিচ্ছি। ওই ছেলেটা অ্যারেস্ট  হয়েছিল, পুলিশের দু একটা ডাণ্ডা খেয়েছে, তাতে কি ? আমিও অ্যারেস্ট হয়েছিলাম। পুলিশ আমাকে টর্চারও করেছে। তোরাও দেড় দু বছর পালিয়ে কাটিয়েছিস। সাফারিংস আমাদের হয়নি ? আর তাছাড়া আমরা তো সংগ্রাম থেকে সরে যাইনি। নানা ভাবে নানা লড়াই-এর সাথে যুক্ত আছি। হয়ত চাকরির জন্যে বা পরিবারের জন্যে অনেক কিছুতে সরাসরি যোগ দিতে পারিনা, তা বলে কি আমরা সব কিছু ছেড়েছুড়ে হাত ধুয়ে বসে আছি ?  তুই যাদের কথা বলছিস, ওরা কোনও সময় আমাদের সঙ্গে ছিল, পরে সরে গেছে। এখন হয়ত একটা লিফলেটও হাতে নিতে ভয় পাবে। 

কথা শেষ করে নবারুণ গেলাসে চুমুক দেয়। যেন মনে পড়ে গেছে এই রকম ভঙ্গীতে উৎপলও গেলাস তুলে এবং চুমুক দিতে গিয়ে দেখে ওর গেলাস খালি। এদিক ওদিক তাকিয়ে উৎপল বোতল খুঁজে নেয় এবং নিজের পেগ পূর্ণ করে। উৎপলের স্ত্রী আসার পর থেকেই রান্না ঘরে নবারুণের স্ত্রীর সাথে আড্ডা জমিয়েছিল। এই মোক্ষম সময়ে বেরিয়ে আসে এবং উৎপলকে নতুন করে গেলাস ভরতে দেখে উদ্বেগ দেখিয়ে বলে,

-      কি গো, ক’ পেগ হল ? গাড়ী চালিয়ে ফিরতে হবে সেটা মনে আছে তো ?

নবারুণ ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলে, কি টাইমিংস। উৎপলের স্ত্রী সোফায় বসে চওড়া করে হাসে। উৎপল অবশ্য স্ত্রীর কথায় মনোযোগ না দিয়ে বলে,  

-      আমি ব্যাপারটাকে অন্য রকম করে দেখছি। আজকে যদি আমাদের কয়েকজনের অবস্থা আগের তুলনায় ভাল হয়ে যায়, সেটা কিসের জোরে ? আমাদের একটাই পুঁজি, আমরা মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে, ছোটবেলা থেকে পড়াশোনা ব্যাপারটা বুঝি। পড়াশোনাটা আমাদের মাথায় ঢোকে। পড়াশোনার জোরে চাকরি পেয়েছি । আর চাকরিতে উন্নতি করেছি কারণ আমাদের দক্ষতা ছিল। দক্ষতার যা যা মানে হয় সব মিলিয়েই বলছি। আসল কথা হচ্ছে আমাদের সব সময়ই ফিরে আসার একটা রাস্তা ছিল। মুভমেন্ট যখন আঘাত পেল, আমরা তখন আবার পড়াশোনার জগতে ফিরে এলাম। জানতাম, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি একটা পাওয়া খুব কঠিন হবেনা, এবং তখন জীবন একটা সহজ খাত খুঁজে পাবে। বিয়ে, বাচ্চাকাচ্চা, প্রমোশন। লোন নিয়ে বাড়ি। নবারুণ আমি ক্লাসের কথা বলছি। ক্লাস হিসেবে কিছু প্রিভিলেজ আমাদের ছিল যেটা হয়ত ঐ বীরেন্দ্র, কার্তিক বা সেই হারানের ছিলনা। বড় রকমের বিপদে পড়লে আমাদেরে বাঁচিয়ে আনার একটা চেষ্টা আমাদের পরিবার করতে পারত। ওদের সেরকম কেউ ছিলনা। আমার মনে হয় যেন কিছু লোক কাদায় ছিল, আমরা বাবু শ্রেণীর কয়েকজন পোশাক ময়লা করে কাদায় নেমেছিলাম ওদেরে তুলে আনব বলে। অঙ্গীকার করেছিলাম সঙ্গে থাকব। তারপর পিঠে ডাণ্ডা পড়তেই দিব্যি ভাল ছেলের মত হাত পা ধুয়ে পড়তে বসে গেলাম।  ওরা পড়ে রইল যে যেখানে ছিল। বাড়তি জুটল পুলিশের থাপ্পড়, কিছু হয়রানি, রুজি রোজগারের ক্ষতি।

নবারুণ একটু চুপ করে যায়। গেলাস ভরে এবং চুমুক দেয়। ওর মুখটা ঘামা ঘামা দেখাচ্ছে। একটা চাপা উত্তেজনার অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে তার হাবভাবে। উৎপল হিসেব করে দেখে, দু পেগ হয়েছে। বিশেষ কারণ না থাকলে এটাই ওদের লিমিট। সে যা যা বলল তা কি নেশার ঘোরে ? বোধহয় একটু বেশী কড়া করে বলা হয়ে গেছে। কিন্তু ও ওর আন্তরিক উপলব্ধির কথাই বলেছে। সত্যিই এই কথাগুলো ওর ভাবনায় আসে।  তবু উৎপল জানে, নবারুণ খুব স্পর্শকাতর। একটা আদর্শ, যেটাকে ওরা পরিত্যাগ করেনি, এবং একটা জীবনযাত্রা, যেটার উপর ওদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই, দুটোর মধ্যে প্রাত্যহিক কিছু সংঘাত থাকে। সেই সংঘাতে ওরা সবাই কিছু না কিছু ক্ষতবিক্ষত। স্বাভাবিকভাবেই নবারুণ বেশী স্পর্শকাতর বলে জ্বালাটা বেশী অনুভব করে। তার মধ্যে আজ এই প্রসঙ্গ তুলে ও হয়ত নবারুণকে একটা কোণে ঠেলে দিয়েছে। সহজাত প্রবৃত্তিতে ও এখন একটা প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতি নেবেউৎপল ঠিক করল এ প্রসঙ্গে আর কথা বাড়াবে না। 

এই সময় নবারুণের স্ত্রী শেষ ক’টি পকোড়া নিয়ে এসে সোফায় বসল এবং একটা মুখে পুরল। কেমন হয়েছে বললে না তো । উৎপল প্রসঙ্গান্তরে যাবার এমন সুযোগ হাতছাড়া করেনা। দারুণরান্নাঘরে লুকিয়ে বসে আছ, তারিফ করার সুযোগই পাচ্ছিনা। কেউ এলেই রান্নাঘরে চলে যাও, তাহলে আড্ডা হয় কি করে। তোমরা তোমাদের আড্ডা দাও, আমরা আমাদের আড্ডা দিই। তোমাদের কথা আমরা বুঝব না, আমাদের কথায় তোমরা মজা পাবেনা। এভাবে আরও কিছুক্ষণ খেজুরি কথাবার্তায় সময় কাটে। এক সময় উৎপলের স্ত্রী তাড়া দেয়, ছেলে একা আছে ঘরে। উঠি উঠছি করে আরও কিছু সময় কাটিয়ে উৎপলরা ওঠে। বাইরে বেরিয়ে এসে চাবির বোতাম টিপে গাড়ীর দরজা খোলে। উৎপলের বউ উঠে বসে। নবারুণ এতক্ষণ বিশেষ কিছু কথা বলেনি। টুকটাক মাথা নেড়ে বা সামান্য মুচকি হেসে আড্ডায় তাল দিয়ে যাচ্ছিল। এবার হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে বলে ওঠে,

-      রিভল্যুশনারি কাজকর্মের সাথে কোনও সেবা প্রতিষ্ঠানের কাজের তুলনা হয় না। মাও জে দং বলেছিলেন না, বিপ্লব কোনও সূচীকর্ম নয়! একটা বড় আন্দোলনে অনেকের অনেক ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। আন্দোলন যারা পরিচালনা করে, তাদের পক্ষে সম্ভব নয় আলাদা ভাবে প্রতিটি ব্যক্তির সমস্যা দেখা, সব সময় সকলের পাশে থাকা। এমন তো নয় যে আমরা কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য এই আন্দোলন গড়ে তুলে ছিলামএমন নয় যে এই আন্দোলন থেকে আমরা কোনও ব্যক্তিগত লাভ কুড়িয়েছি। আমাদের আন্তরিকতায়, আমাদের ডেডিকেশনে ফাঁকি ছিল না। আর স্যাক্রিফাইস কি আমাদের কম ছিল ? যদি এই আন্দোলনের রাস্তায় না হেঁটে আমরা ক্যারিয়ারিস্ট হতাম, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতাম, কিরকম রেজাল্ট করতে পারতাম বল। অতগুলো বছরও নষ্ট হত না, ভাল রেজাল্ট করে অনেক বড় চাকরি করতাম। যেখানে আছি তার অনেক বেশী উঁচুতে থাকতে পারতাম। আরো আয়েসের জীবন পেতে পারতাম। কই, তার জন্য তো আমরা কেউ কোনও আফসোস করি না।

উৎপল নবারুণকে সময় দেয় পুরো কথাটা বলার। দাঁড়িয়ে কথাটা শুনে। কিছুই নতুন কথা নয়। কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়না। ওর স্ত্রী গাড়িতে উঠে বসে আছে। নবারুণের স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে অতিথি বিদায়ের বাকী ফর্মালিটি সারবে বলে। তবু উৎপল কিছুটা সময় দেয় যাতে নবারুণের কথাটা তার প্রয়োজনীয় স্পেস পায়। তারপর বলল, চলি।  নবারুণ অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ায়। 

নবারুণের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে উৎপল গাড়ীতে উঠে বসে স্টার্ট দিল। হাত নাড়িয়ে রওয়ানা হল।

বাড়ি ফিরে জামা কাপড় পালটে হাত মুখ ধুয়ে উৎপল খেতে বসেছে, নবারুণের আবার ফোন। উৎপল খেতে খেতেই ফোন ধরে, হ্যাঁ, বল।

-      ঘুমিয়ে পড়েছিস ?

-      না।

ভূমিকা না করে নবারুণ বলতে থাকে

-      আমার সত্যিই কোনও গিল্‌টি ফিলিং হচ্ছে না। .........  জেল থেকে বেরিয়ে .........  ......... পুরোনো মুভমেন্টে ফিরে যাওয়ার ............ ছেড়ে দিইনি। অন্য ফ্রন্টে ......... চাকরি বাকরির কিছু বাধ্য বাধকতা থাকে।

নবারুণের উচ্চারণ জড়ানো। কেমন যেন আহত শোনাচ্ছে ওর গলা। উৎপল মোবাইল কানে লাগিয়ে খাওয়ায় মন দেয়। ওদিকে নবারুণ বলে চলেছে -

......... কিন্তু আমি তো সরে আসিনি ........... যেবার আমি অ্যারেস্ট হলাম, তোরা তো জানিস ....... অ্যাক্‌টিভ যোগাযোগ রাখি ...... আমিই হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা......
________________________
(একা এবং কয়েকজন, গুয়াহাটি, ২০১৪)